Questions in this chapter
আমরা ছেলেকে স্কুল-কলেজে পাঠিয়ে ভাবি যে, শিক্ষা দেওয়ার সমস্ত কর্তব্য পালন করলাম। বছরের পর বছর পাস করে গেলেই অভিভাবকরা যথেষ্ট তারিফ করেন। কিন্তু তলিয়ে দেখেন না যে, কেবল পাস করলেই বিদ্যা অর্জন হয় না। বাস্তবিকপক্ষে ছাত্রের বা সন্তানের মনে জ্ঞানানুরাগ বা জ্ঞানের প্রতি আনন্দজনক শ্রদ্ধার উদ্রেক হচ্ছে কিনা, তাই দেখবার বিষয় । জ্ঞান চর্চার মধ্যে যে এক পরম রস ও আত্মপ্রসাদ আছে, তার স্বাদ কোন কোন শিক্ষার্থী এক বিন্দুও পায় না ।
নিন্দুকেরে বাসি আমি সবার চেয়ে ভালো,
যুগ জনমের বন্ধু আমার আঁধার ঘরের আলো
সবাই মোরে ছাড়তে পারে বন্ধু যারা আছে,
নিন্দুক সে ছায়ার মত থাকবে পাছে পাছে।
বিশ্বজনে নিঃস্ব করে, পবিত্রতা আনে
সাধক জনে নিস্তারিতে তার মত কে জানে?
বিনামূল্যে ময়লা ধুয়ে করে পরিষ্কার
বিশ্বমাঝে এমন দয়াল মিলবে কোথা আর?
নিন্দুক সে বেঁচে থাকুক বিশ্বহিতের তরে,
আমার আশা পূর্ণ হবে তাহার কৃপা ভরে ।
বিশ্বজোড়া পাঠশালা মোর সবার আমি ছাত্র
নানান ভাবে নতুন জিনিস শিখছি দিবারাত্র।
এ পৃথিবীর বিরাট খাতায়,
পাঠ্য যেসব পাতায় পাতায়;
শিখছি সেসব কৌতূহলে, সন্দেহ নাই মাত্র
রঙহীন মিলহীন ভাষা এবং রাষ্ট্রে
বিভক্ত এ মানুষ দ্বন্দ্ব সংঘাতে লিপ্ত
যুদ্ধ মারামারি হানাহানি সবই আছে জানি
তারপরও এগিয়ে যাচ্ছে মানুষ
এতো প্রগতির পদক্ষেপ সভ্যতার
পদচিহ্ন এঁকে দিচ্ছে সারা বিশ্বময়
ওরা বলছে আমরা মানুষ আছি এভাবে
জগৎ জুড়ে প্রীতির বন্ধন আর স্বভাবে।
জীবসত্তা সেই ঘরের নিচের তলা, আর মানবসত্তা বা মনুষ্যত্ব ওপরের তলা। জীবসত্তার ঘর থেকে মানবসত্তার ঘরে উঠবার মই হচ্ছে শিক্ষা। শিক্ষাই আমাদের মানবসত্তার ঘরে নিয়ে যেতে পারে। অবশ্য জীবসত্তার ঘরেও সে কাজ করে; ক্ষুৎপিপাসার ব্যাপারটি মানবিক করে তোলা তার অন্যতম কাজ। কিন্তু তার আসল কাজ হচ্ছে মানুষকে মনুষ্যত্বলোকের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া। অন্য কথায় শিক্ষার যেমন প্রয়োজনের দিক আছে, তেমনি অপ্রয়োজনের দিকও আছে। আর অপ্রয়োজনের দিকই তার শ্রেষ্ঠ দিক। সে শেখায় কী করে জীবনকে উপভোগ করতে হয়, কী করে মনের মালিক হয়ে অনুভূতি ও কল্পনার রস আস্বাদন করা যায় ।
শিক্ষা একমুখী হওয়া কিছু নহে। মানুষের মনকে যদি একটি পায়রার ঘরের সঙ্গে তুলনা করা যায়, তবে সর্বতোমুখী শিক্ষা উহার সকল দ্বার উন্মুক্ত করিয়া রাখে। এই অসীম বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে চক্ষু উন্মীলন করিলেই কৃত বিষয় দেখিতে পাওয়া যায়, তাহা হইলে অনেক জ্ঞান লাভ করা যায়। কিন্তু যাহার মনের সকল দ্বারগুলি খোলা নাই, যাহার মনোবৃত্তিসমূহ সম্যক পুষ্ট নহে, তাহার পক্ষে সমস্তই অন্ধকার। পরন্তু যাহার সেই দ্বারগুলি খোলা সে যে দিবানিশি জ্ঞান সঞ্চয় করিতে পারে তাহাই নহে সে ইহার ব্যবহারও করিতে পারে।
দেখ আমি চোর বটে, কিন্তু আমি কি সাধ করিয়া চোর হইয়াছি? খাইতে পাইলে কে চোর হয়? দেশে যাঁহারা বড় বড় সাধু, চোরের নামে শিহরিয়া উঠেন, তাঁহারা অনেকে চোর অপেক্ষাও অধার্মিক। তাঁহাদের চুরি করিবার প্রয়োজন নাই বলিয়াই চুরি করেন না। কিন্তু তাহাদের প্রয়োজনাতীত ধন A 1 থাকিলেও চোরের প্রতি মুখ তুলিয়া চাহে না, ইহাতেও চোরে চুরি করে। অধর্ম চোরের নহে— চোর যে চুরি করে, সে অধর্ম কৃপণ ধনীর। চোর দোষী বটে, কিন্তু কৃপণ ধনী তদপেক্ষা শতগুণে দোষী। চোরের দণ্ড হয়; চুরির মূল যে কৃপণ, তার দণ্ড হয় না কেন?
পৃথিবীতে কত দ্বন্দ্ব কত সর্বনাশ,
নূতন নূতন কত গড়ে ইতিহাস-
রক্ত প্রবাহের মাঝে ফেনাইয়া উঠে
সোনার মুকুট কত ফুটে আর টুটে
সভ্যতার নব নব কত তৃষ্ণা ক্ষুধা-
উঠে কত হলাহল উঠে কত সুধা ।
শুধু হেথা দুই তীরে, কেবা জানে নাম,
দোঁহা পানে চেয়ে আছে দুইখানি গ্রাম ।
এই খেয়া চিরদিন চলে নদী স্রোতে
কেহ যায় ঘরে কেহ আসে ঘর হতে।
কহিল মনের খেদে মাঠ সমতল
মাঠ ভরা দেই আমি কত শস্য ফল;
পর্বত দাঁড়ায়ে রহেন কি জানি কি কাজ
পাষাণের সিংহাসনে তিনি মহারাজ ।
বিধাতার অবিচার কেন উঁচু-নিচু
সে কথা আমি নাহি বুঝিতে পারি কিছু
গিরি কহে সব হলে সমতল পারা,
নামিত কি ঝরনার সুমধুর ধারা ?
খুব ছোট ছিদ্রের মধ্য দিয়ে যেমন সূর্যকে দেখা যায়, তেমনি ছোট ছোট কাজের ভেতর দিয়েও কোনো ব্যক্তির চরিত্র ফুটে ওঠে। বস্তুত মর্যাদাপূর্ণভাবে ও সুচারুরূপে সম্পন্ন ছোট ছোট কাজেই চরিত্রের পরিচয় । অন্যের প্রতি আমাদের ব্যবহার কিরূপ তাই হচ্ছে আমাদের চরিত্রের শ্রেষ্ঠ পরীক্ষা। বড়, ছোট ও সমতুল্যের প্রতি সুশোভন ব্যবহার আনন্দের নিরবিচ্ছিন্ন উৎস।
শ্রমকে শ্রদ্ধার সঙ্গে গ্রহণ কর। কালিধুলার মাঝে, রৌদ্রবৃষ্টিতে কাজের ডাকে নেমে যাও। বাবু হয়ে ছায়ায় পাখার তলে থাকবার কোনো দরকার নেই। এ হচ্ছে মৃত্যুর আয়োজন। কাজের ভেতর কুবুদ্ধি, কুমতলব মানবচিত্তে বাসা বাঁধতে পারে না। কাজে শরীরে সামর্থ্য জন্মে, স্বাস্থ্য, শক্তি, আনন্দ, স্ফূর্তি সকলই লাভ হয়। পরিশ্রমের পর যে অবকাশ লাভ হয় তা পরম আনন্দের অবকাশ। তখন কৃত্রিম আয়োজন করে আনন্দ করার কোনো প্রয়োজন হয় না। শুধু চিন্তার দ্বারা জগতের হিত সাধন হয় না। শুধু চিন্তা করে মানুষ পূর্ণ জ্ঞান লাভ করতে সমর্থ হয় না। মানুষের সঙ্গে কাজে, রাস্তায়, কারখানায়, মানুষের সঙ্গে ব্যবহারে মানুষ নিজেকে -- পূর্ণ করে। চিন্তা ও পুস্তক মানবমনের পাপড়ি খুলে দেয় মাত্র; বাকি কাজ সাধিত হয় সংসারের কর্মক্ষেত্রে।
সবারে বাসরে ভাল
নইলে মনের কালো মুছবে নারে !
আজ তোর যতো ভাল
ফুলের মতো দে সবারে
করি তুই আপন আপন
হারালি যা ছিল আপন,
এবার তোর ভরা আপন
বিলিয়ে দে তুই যারে তারে
যারে তুই ভাবিস ফণী,
তারো মাথায় আছে মণি
বাজা তোর প্রেমের বাঁশি
ভবের বনে ভয় বা কারে?
সবাই যে তোর মায়ের ছেলে
রাখবি কারে, কারে ফেলে?
একই নায়ে সকল ভায়ে
যেতে হবে রে ওপারে ।
যে সকল জিনিস অন্যের হৃদয় সঞ্চারিত হইবার জন্য প্রতিভাশালী হৃদয়ের কাছে সুর, রং ইঙ্গিত প্রার্থনা করে, যাহা আমাদের হৃদয়ের দ্বারা সৃষ্টি না হইয়া উঠিলে অন্য হৃদয়ের মধ্যে প্রতিষ্ঠা লাভ করিতে পারে না, তাহাই সাহিত্যের সামগ্রী। তাহা আকারে-প্রকারে, ভাবে-ভাষায়, সুরে-ছন্দে মিলিয়া তবেই বাঁচিতে পারে। তাহা মানুষের একান্ত আপনার; তাহা আবিষ্কার নহে, অনুকরণ নহে, তাহা সৃষ্টি। সুতরাং তাহা একবার প্রকাশিত হইয়া উঠিলে তাহার রূপান্তর অবস্থান্তর করা চলে না। তাহার প্রত্যেক অংশের উপর তাহার সমগ্রতা একান্তভাবে নির্ভর করে। যেখানে তাহার ব্যত্যয় দেখা যায়, সেখানে সাহিত্যে অংশে তাহা হেয় ।
আমার বিবেচনায় স্বাস্থ্যরক্ষার উপায় গৃহ ও পল্লীতে পরিষ্কার, বিশুদ্ধ জল ও বায়ুর ব্যবস্থা নির্ধারণ। এসব বিষয়ে শিক্ষাবিস্তার এবং আদর্শ গঠিত পল্লী প্রদর্শন অতি সহজেই হইতে পারে। ইহার উপায় মেলা স্থাপন। পর্যটনশীল মেলা দেশের এক প্রান্ত হইতে আরম্ভ করিয়া অল্পদিনেই অন্য প্রান্তে পৌছিতে পারে। এই মেলায় স্বাস্থ্যরক্ষা সম্বন্ধে ছায়াচিত্রযোগে উপদেশ, স্বাস্থ্যকর ক্রীড়া-কৌতুক ও ব্যায়াম প্রচলন, যাত্রা, কথকতা, গ্রামের শিল্প- বস্তুর সংগ্রহ, কৃষি-প্রদর্শনী ইত্যাদি গ্রামহিতকর বহুবিধ কার্য সহজেই সাধিত হইতে পারে। আমাদের কলেজের ছাত্রগণও এই উপলক্ষে তাঁহাদের দেশ পরিচর্যাবৃত্তি কার্যে পরিণত করিতে পারেন।
পরের মুখে শেখা বুলি পাখির মত কেন বলিস?
পরের ভঙ্গি নকল করে নটের মত কেন চলিস?
তোর নিজস্ব সর্বাঙ্গে তোর দিলেন ধাতা আপন হাতে
মুছে সেটুকু বাজে হলি, গৌরব কি বাড়ল তাতে?
আপনারে যে ভেঙে চুরে গড়তে চায় পরের ছাঁচে অলীক,
ফাঁকি, মেকি সে জন নামটা তাঁর কদিন বাঁচে?
পরের চুরি ছেড়ে দিয়ে আপন মাঝে ডুবে যা রে
খাঁটি ধন যা সেথায় পাবি, আর কোথাও পাবি না রে
প্রদত্ত পারিভাষিক শব্দ দিয়ে বাক্য গঠন কর:
পাদটীকা, প্রজ্ঞাপন, পুরাণ, ক্রোড়পত্র, হালনাগাদ।
ভাব সম্প্রসারণ কর:
পরের অভাব মনে করিলে চিন্তন
আপন অভাব-ক্ষোভ থাকে কতক্ষণ?
ভাব সম্প্রসারণ কর:
সত্য যে কঠিন,
কঠিনেরে ভালোবাসিলাম,
সে কখনো করে না বঞ্চনা।
ভাব-সম্প্রসারণ কর (অনধিক পাঁচটি বাক্যে):
এ বয়সে তাই নেই কোনো সংশয়-
এ দেশের বুকে আঠারো আসুক নেমে।
সারমর্ম লেখ (অনধিক চার বাক্যে):
তাই আমি মেনে নিই সে নিন্দার কথা
আমার সুরের অপূর্ণতা।
আমার কবিতা, জানি আমি,
গেলেও বিচিত্র পথে হয় নাই সে সর্বত্রগামী।
কৃষাণের জীবনের শরিক যে জন,
কর্মে ও কথায় সত্য আত্মীয়তা করেছে অর্জন,
যে আসে মাটির কাছাকাছি,
সে কবির বাণী-লাগি কান পেতে আছি।